মেসি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য -সর্বকালের সেরা এই খেলয়ার সম্পর্কে জানুন

একটি অতি হত দরিদ্র পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। চার ভাই বোনের মাঝে তিনি হলেন তৃতীয়। ছোটকাল থেকেই তার শরীরে হরমোনের অভাব থাকার কারণে ডাক্তাররা বলেছিল তার বড় হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। একদমই ছিল না যে তা নয় তবে তার পরিবারের যে অবস্থা ছিল তাদের দ্বারা এত টাকা খরচ করে সেই হরমোন পূরণের সামান্য চেষ্টা করার কোন উপায় ছিল না।-Facts About Lionel Messi

ছোট কালের সেই ছেলেটার আজকের পরিচয় বিশ্ব ফুটবলের এক জাদুকর। সত্যি কারের এক কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। যার নামের পাশে কম নেই কোন অর্জনেরই। তবে মেসি আদৌ লোকের কথা শুনেন আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ কিংবা কোন মেজর টুর্নামেন্ট জিততে না পারার কারণে।

যাই হোক বড় হতে না পারার সম্ভাবনা থেকে দরিদ্র পরিবারের সেই ছেলেটা কিভাবে বনে গেলেন ফুটবল বিশ্বের রাজা। আমাদের আজকের পোস্টে থাকছে সেই সব অজানা তথ্য।

বর্তমান সময়ের পাশাপাশি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হোর হে হোরাসিও সেখানকার এক স্টিল কারখানায় কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে তার মা ছিলেন পার্ট টাইম ক্লিনার সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিতিনি। তার পৈতৃক পরিবারে আদি অবস্থান ছিল ইতালির অকনা শহরে। তার পূর্বপুরুষদের একজন এঞ্জলো মেসি ১৮৮৩ সালে সেখান থেকে আর্জেন্টিনায় চলে আসেন। মেসির বড় দুই ভাই এবং এক ছোট বোন রয়েছে। বড় দুই ভাইয়ের নাম রদ্রিগো এবং মাতিয়াস এবং ছোট বোনের নাম মারিয়া সল।

পাঁচ বছর বয়সে মেসি স্থানীয় ফুটবল ক্লাব গান জিও লোর হয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন। যার কোচ ছিলেন তার বাবা হোর হে। একদিন নিউ ওয়েলস্ ওল্ড বয়েজ এর মাঠের সবচেয়ে ছোটখাটো সবচেয়ে দুর্বল ছেলেটা তার থেকে আধ হাত লম্বা সব খেলোয়ারদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে একের পর এক গোল দিয়ে যাচ্ছে। বল টা মনে হচ্ছিল চুম্বক দিয়ে তার পায়ে লাগানো রয়েছে। পা থেকে সরছেই না। বাকি খেলোয়াড় রাও একটু পর মনে হল হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর সেই ছোট ছেলেটা বড় বড় গোল দিতে লাগলো।

সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন কারলোস রেক্সাস। যিনি ছিলেন বার্সেলোনার সাবেক খেলোয়ার ও কোচ। তবে সেসময় তার কাজ ছিল দেশে-বিদেশে ঘুরে ঘুরে বিখ্যাত “লা মেসিয়া” একাডেমির জন্য প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করা। এই চাকরির জন্য জীবনে হয়তো বা কার্লোস কত প্রতিভাই আবিষ্কার করেছেন।

তবে সেদিন তিনি যে প্রতিভা দেখলেন তা তার কাছে অকল্পনীয় অসম্ভব মনে হল। যাই হোক সেদিনের সেই আধ হাত লম্বা ছেলেটাই আজকের লিওনেল মেসি। কারলোস রেকসাস আর্জেন্টিনায় এসেছিলেন প্রতিভার খোঁজে। সেবার আর্জেন্টিনার কিশোর ফুটবলারদের দেখে তেমন মন ভরছিল না তার। তিনি খুঁজছিলেন এমন কাউকে সবার মাঝে অনন্য হবে যে ইংরেজিতে Standout বলা হয় যাকে।

Lionel Messi

বোকা জুনিয়ার্স থেকে শুরু করে অনন্য বড় বড় আর্জেন্টাইন ক্লাব ঘুরে যে খোঁজ তিনি পাচ্ছিলেন না নিউ ওয়েল স ওল্ড বয়েজের মত ছোট ক্লাবের মাঠে তিনি তার মনের মত ফুটবলার পেয়ে গেলেন। বুঝে গিয়েছিলেন এই অমূল্য রত্ন হাতছাড়া করা হবে বিশাল বোকামি। কারোলোস তাৎক্ষণিক চলে গেলেন মেসির বাবা মায়ের কাছে। একেবারে সোজাসাপ্টা ভাবে বলে দিলেন বার্সেলোনার একাডেমির জন্য তাদেরকে মেসিকে চাই।

মেসির বাবা মায়ের উত্তর অবাক করে দিল তাকে। মেসির বাবা-মায়ের জবাব ছিল এমন যে “মেসি আর বড় হবে না, কারলোস রেক্সাস্ যেন আকাশ থেকে পড়লেন। হরেহে মেসি খুলে বললেন সব। মেসির একটা বিরল সমস্যা রয়েছে। তার গ্রোথ হরমোনের বড় একটি ঘাটতি রয়েছে। আর এই গ্রোথ হরমোন না থাকলে সে আর কখনো বড় হতে পারবে না।

হরহে সেলিনা মিলিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছেন। এই সমস্যা সমাধানও পেয়েছেন। কিন্তু নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের এই দম্পতির পক্ষে প্রতি মাসে শত শত ডলার খরচ করে মেসির থেরাপি করা অসম্ভব। আর তাই মেসিকে নিয়ে তারা মহাসংকিত। বাচ্চা ছেলেটার কি যে হবে। এসব কিছু জেনে হতাশ হলেন করলোস।

তবে হতাশ হলেও হাল ছাড়লেন না তিনি। কারলোস মানুষটা হার মানতে জানেন না। সেবারের মতো ফিরে গেলেন তিনি বার্সেলোনায়। সাথে নিয়ে গেলেন ছোট মেসির পায়ের অস্বাভাবিক যাদুর স্মৃতি। শুধু ফিরলেনই না, বার্সা বোর্ডকে রাজীও করালেন মেসির হরমোনের চিকিৎসা নিশ্চিত করানোর জন্য।

সময়টা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বছর। ২০০০ সাল বার্সা সেটা মেনে নিল। তবে আরেকটি সমস্যা ছিল। মেসি বাবা-মাকে ছাড়া কিভাবে থাকবে। সেটারও সমাধান হলো, মেসির বাবা-মা চলে এলেন স্পেনে। ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিলেন। এক মেসির জন্য এতটা ত্যাগ স্বীকার করলেন হুর হে দম্পতি।

নিয়তি তাদের এই ঋণ সুদ সমেত ফেরত দিতে দেরি করেনি। সময়ের সাথে সাথে নিজেকে গড়ে তোলা মেসি দুই হাজার থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনার যুব একাডেমির ইনফান্তিল বি, কাদেতে বি এবং কদেতে এ দলের খেলেছেন। কদেতে এ দলে খেলার সময় তিনি ৩০ খেলায় ৩৭ গোল করেন।

২০০৩ সালে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে ক্লাব থেকে প্রায় ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যুবদলের প্রশিক্ষণ কর্মীদের জোরাজোরিতে ক্লাবের ব্যবস্থাপনা পরিষদ তাকে দলে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৩-৪ মৌসুমে মেসি পাঁচটি আলাদা দলের খেলেন। যা একটি রেকর্ড। তিনি হুবে নিল বি দলে খেলে একটি গোল করেন এবং হূবে নীল এ দলে খেলার সুযোগ লাভ করেন।

সেখানে তিনি ১৪ খেলায় ২১ টি গোল করেন। ২০০৩ সালের ২৯ নভেম্বর বার্সেলোনা সি দলে এবং ২০০৪ সালের ৬ মার্চ বার্সেলোনা বি দলে তার অভিষেক হয়। ওই মৌসুমে তিনি উভয় দলের হয়েই খেলেন এবং সি দলের হয়ে তার গোল সংখ্যা ছিল ১০ খেলায় পাঁচ। এবং বি দলের হয়ে ৫ খেলায় ছিল শুন্য।

এই দুই দলে অভিষেকের পূর্বে মেসির দাপ্তরিক অভিষেক হয়েছিল ২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর। পোর্তোর বিপক্ষে একটি প্রীতি খেলার দিন তার বয়স হয়েছিল ১৬ বছর ১৪৫ দিন।

messi facts

২০০৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো বার্সেলোনা মেসির সাথে তাদের চুক্তি নবায়ন করে। এ সময় মূল দলের খেলোয়াড় হিসেবে মেসির পারিশ্রমিক বাড়ানো হয় এবং চুক্তি এর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত করা হয়।

মেসি ২০০৬-৭ মৌসুমে কিংবদন্তি ডিয়াগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত কিছু গোলের পুনরাবৃত্তি ঘটান। এবং নিজেকে নতুন ম্যারাডোনা রূপে প্রকাশ করেন।

২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল কোপা সেমিফাইনালে খেতাবের বিপক্ষে মেসি জোড়া গোল করেন। যার মধ্যে একটি গোল ছিল ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা দ্বিতীয় গোলটির মতো। যে গোলটি শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে খ্যাত।

বিশ্বের ক্রীড়া মাধ্যম মেসিকে ম্যারাডোনার সাথে তুলনা করতে শুরু করে। এবং স্পেনীয় সংবাদ মাধ্যম তাকে মেসিডোনা উপাধিতে ভূষিত করেন। ম্যারাডোনার মত মেসি ও প্রায় ৬২ মিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে গোল রক্ষক সহ ছয় জনকে কাটিয়ে একই স্থান থেকে গোল করেছিলেন। এবং কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। একুশ বছর আগে মেক্সিকো বিশ্বকাপে যেমনটি করেছিলেন ম্যারাডোনা।

স্পানিওল এর বিপক্ষে মেসি একটি গোল করেছিলেন। যা ছিল ম্যারাডোনার হ্যান্ড অফ গড খ্যাত গোলটির মতো। যেটি ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার করা প্রথম গোল ছিল। সেই যে শুরু, এরপর থেকে মেসিকে আর রুখে কে! ২০০৯ থেকে একরকম অপ্রতিরোধ্য ক্রিমিল মেসি ৫ বার বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়েছেন। এর মধ্য টানা বিশ্বসেরা হয়েছেন চারবার।

নামের পাশে একগাদা রেকর্ড। একগাদা অ্যাওয়ার্ড। বার্সার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল করেছেন এবং করিয়েছেন। বার্সার হয়ে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ছয়টি কাপ জিতেছেন। সাতবার বেলন ডিওর জিতেছেন। আরো কত কত কৃতিত্ব যে তার ঝুলিতে তা বলে শেষ করা যাবে না।

সব থেকে বড় কথা হল বিশ্বের সেরা দুজন খেলোয়াড়ের একজন হয়েও পৃথিবীর সব থেকে ধনী এক এথলেট দের একজন হবার পরেও মেসি এখনো সেই ওল্ড বয়েজের নির্লিপ্ত সরল ছোট্ট ছেলেটিই আছে। যশ তাকে ছোয়নি, অহমিকা তাকে আঁকড়ে ধরেনি। আর তাই মেসি বিশ্বের সেরা খেলোয়ার কিনা এমন প্রশ্নে মেসির সহজ সরল উত্তর “কে সেরা এটা আমার মাথাব্যথা নয়, বার্সেলোনা রিয়াল মাদ্রিদ এ থেকে ভালো খেললেই চলবে।”

বিশ্বসেরা হবার পরেও তার এই নম্রতা আমাদেরকে মুগ্ধ করে। প্রতিনিয়ত ফুটবলের জাদু দিয়ে মুগ্ধ করেছে যিনি সারা বিশ্বকে বাস্তব জীবনে সেই মেসি অদ্ভুত সরল। সম্প্রতি বিয়েও করেছেন ছোটবেলার বান্ধবী অন্তনেল্লা রুকুজ্জ কে। এত যশ এত বিত্তের মালিক হয়েও উদ্দাম জীবন যাপন তাকে টানেনি। মেসি রয়ে গেছেন সেই ছোটবেলার মেসিই।

মেসির ক্যারিয়ার এ একটি অপ্রাপ্তি। দেশের হয়ে অলিম্পিকের বয়স ভিত্তিক টুর্নামেন্ট ছাড়া আর কিছুই জেতা হয়নি তার। একটা বিশ্বকাপের খুব দরকার এই কিংবদন্তির। ২০১৪ তে বিশ্বকাপের খুব কাছাকাছি গিয়েও ছুঁতে পারেনি আর্জেন্টিনা।

মেসি কেবল আর্জেন্টাইন এক কিংবদন্তি কিংবা বার্সার সর্বকালের সেরা খেলোয়ারি নন। সারা বিশ্বের হাজারো মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিতিনি নামের এই ছোটখাটো ফুটবল খেলোয়ার।

হরমোনের ঘাটতি, বাবা-মায়ের দারিদ্র কোন কিছুই তাকে রুখতে পারেনি সেরা হওয়া থেকে। সকল বাঁধাকে তুরি মেরে উড়িয়ে অমরত্তের পথে এগিয়ে গিয়েছেন মেসি। সাফল্যের স্বর্ণশেকড় আগলে নিয়েছে তাকে পরম যতনে। এই বিশ্বকাপ এই সম্ভবত তার শেষ সুযোগ। আর্জেন্টিনার হয়ে অমরত্ব অর্জনে পারবেন কি মেসি!

Lionel Andrés Messi Cuccittini

২০১৭ সালের জুলাই এ জন্মস্থান আর্জেন্টিনার রোজারিও তে রাজকীয় আয়োজনে দীর্ঘদিনের বান্ধবী ও তার দুই সন্তানের মা রুকুজ্জোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন লিওনেল মেসি। বার্সেলোনা এবং আর্জেন্টিনার হয়ে সুনাম পুড়িয়ে এখন তিনি পিএসজি ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

বিয়ের পর তার পরিবার জুড়ে আসেন আরো এক ছেলে। সব মিলিয়ে পাঁচ জনের পরিবারে দারুন দিন কাটছে তার। সে শৈশব থেকেই মেসি ভোজন রসিক। তবে খুব সাধারণ খাবার তার পছন্দ।

মেসি প্লে স্টেশনের দারুন ভক্ত। মাঠ এবং মাঠের বাইরে তিনি সময় পেলেই ঘন্টার পর ঘন্টা প্লে স্টেশনে গেম খেলে সময় কাটান।

গোল করার পর একটি বিশেষ ভঙ্গিমায় উদযাপন করেন মেসি। অনেকেই হয়তো জানেন না যে দুই হাত তুলে আকাশের দিকে ইশারা করে তিনি যে উদযাপন করেন তা আসলে কার উদ্দেশ্যে! আসলে দাদিকে উৎসর্গ করে এমন উদযাপন করেন তিনি।

মেসি ট্যাটু ভালোবাসেন। তার বা কাঁধে তার মায়ের চেহারার আদলে ট্যাটু আঁকা রয়েছে। ডান কাঁধে নিজের ছেলের নাম অঙ্কিত ট্যাটু করিয়েছেন তিনি। আসন্ন কাতার বিশ্বকাপ এর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল এই ফরোয়ার্ড আর্জেন্টাইন ফুটবলার এর প্রতি।

আরো দেখুনঃ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *