নরওয়ে সম্পর্কে অজানা তথ্য -সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের মধ্য একটি

আমাদের আজকের পোস্টে ইউরোপ মহাদেশের একটি দেশ নরওয়ে সম্পর্কে বিস্তারিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হলো। নরওয়ে এর সরকারি নাম কিংডম অফ নরওয়ে। একটি উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডে নেভিয়া এর পশ্চিম অংশে অবস্থিত। দেশটির পূর্ব সীমান্তে সুইডেন উত্তর পূর্বে ফিনল্যান্ড এবং রাশিয়া। এবং দক্ষিণ অপরপ্রান্তে ডেনমার্ক অবস্থিত।

অর্থনৈতিক দিক থেকে নরওয়ে একটু বেশি সমৃদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচাইতে বেশি তেল এবং গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পন্ন দেশ এটি। ২০০৯ সাল থেকে বিশ্ব মানব উন্নয়ন শীর্ষ সূচক স্থানটি ধরে রেখেছে নরওয়ে।-Facts About Norway

দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক কথায় শ্বাসরুদ্ধকর। অরোরা বালিয়াড়ি তুষার ঢাকা বিস্তৃত মালভূমি আর অবিশ্বাস্য সুন্দর সব পর্বতমালা দিয়ে ঢাকা এই দেশটি। ভ্রমণের জন্য বিশ্বের সেই সেই স্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে নরওয়ে।

নরওয়ের ইতিহাসের মধ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভাইকিংস এর আক্রমণ। যারা ৮০০০ থেকে ১০৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এদেশে রাজত্ব করে। ঐতিহাসিকভাবে নরওয়েতে ভাইকিংস যুগের সূচনা হয় ৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। এবং শেষ হয় ১০৮৬ খ্রিস্টাব্দে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ যুদ্ধের মাধ্যমে। যেখানে রাজা হেরালদের বাহিনী ভাইকিংদের পরাজিত করে। মূলত এরপর থেকেই দেশটিতে রাজতন্ত্র বিদ্যমান। দেশটিতে রাজতন্ত্র এক ১১৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত।

৩ লাখ ৮৫ হাজার ২০৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫.৩৭৯ মিলিয়ন এর বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে দেশটি ইউরোপের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন জনঘনত্ব বিশিষ্ট রাষ্ট্র। নরওয়েজিয়ান এবং সামী এদেশের দুটি সরকারি ভাষা। তবে নরওয়েজিয়ান এদেশের বিস্তৃত এবং প্রধান সরকারি ভাষা।

খ্রিস্ট ধর্ম নরওয়ের প্রধান ধর্ম। এ দেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী। বাকিদের মধ্য ১৭ শতাংশ মানুষ এমন যারা কোন ধর্মেই বিশ্বাস করে না। এদেশে ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষের সংখ্যা প্রায় চার শতাংশ। এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

অসলো নরওয়ের রাজধানী এবং সবচেয়ে জনবহুল শহর। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার শহর গুলোর মধ্যেও আসলো সবচেয়ে প্রাচীনতম। শহরটি ১০৪৮ সালের প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি এক সময় জলদস্যুদের শহর হিসেবে কুখ্যাত ছিল। বর্তমানে শহরটি নরওয়ের অর্থনৈতিক এবং সরকারি কেন্দ্র। এটি নরওয়েজিয়ান বাণিজ্য ব্যাংকিং শিল্প ও শিপিং এর কেন্দ্রবিন্দু।

শহরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথাও আলাদাভাবে বলতেই হয়। মে মাসের শেষে শহরটি সবুজে ভরে যায়। অসলোর সব থেকে জনপ্রিয় জায়গা হল ভিজিল্যান্ড পার্ক। সবুজ গাছপালা এবং পুকুর নিয়ে বিস্তৃত এই প্রান্তর বাস্তবিকি ভালোলাগার জায়গা।

নরওয়ের রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা পার্লামেন্ট মন্ত্রিসভা ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যবিভক্ত। নরওয়ে বছরের ৮ মাস বরফের নিচে ঢাকা থাকে। বছরে দুই মাস এখানে সূর্য ওঠে না।

নভেম্বরের ২১ তারিখ থেকে জানুয়ারির ২১ তারিখ পর্যন্ত তাই ডার্ক পিরিয়ড বলা হয়। আবার বছরে দুই মাস এখানে সূর্য অস্ত যায় না। মে মাসের ২১ তারিখ থেকে জুলাই এর ২১ তারিখ এই সময়টাকে বলা হয় মিডনাইট সান এর সময়। কারণ এ সময় রাত 2 টার সময় ও ঝকঝকে রোদ দেখা যায়।

মধ্য রাতের সূর্যের মতো আরো একটি মনোমুগ্ধকর ঘটনা হচ্ছে রাতের আকাশ জুড়ে বর্ণিল আলোর খেলা। যা “অরোরা বলিয়ারিস বা নর্দার্ন লাইটস” নামে পরিচিত। এই মহাজাগতিক আলোর খেলা সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অন্ধকার রাত্রিতে দেখতে পাওয়া যায়।

নরেতে রয়েছে হাজার হাজার নয়না ভিরাম হ্রদ। মনমুগ্ধকর সৌন্দর্যের পাশাপাশি এ সকল রোদে পাওয়া যায় ইউরোপের সবচেয়ে সুস্বাদু স্যামন মাছ। এছাড়াও ইউরোপের সবচেয়ে গভীর হ্রদ নরওয়েতে অবস্থিত।

নরওয়েতে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সুরঙ্গ পথ। যা ২৪.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সম্পূর্ণ পথটির বেশিরভাগই রঙিন আলো দিয়ে সুসজ্জিত। যাতে করে টানেলটি পার হওয়া চালকদের জন্য কম অস্বস্তি কর হয়।

বর্তমান বিশ্বে নরওয়ে দেশ শান্তির পরিচয় হিসেবে। প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে অসলোর বিশ্ব বিখ্যাত সিটি হল থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়।

নরওয়ে এর সৌন্দর্যের আধার বলা হয় উত্তর নরওয়ে অবস্থিত লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জ। এখানে দৃষ্টিনন্দন বেলাভূমি থেকে শুরু করে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণী এবং রহস্যময় সমুদ্রখাড়ি ছবির মত সুন্দর জেলেদের গ্রাম এবং সবুজের সমারোহ। কিছু সূত্র হতে জানা যায় এই দ্বীপে ১১ হাজার বছর ধরে জনবসতি রয়েছে।

“ফ্রেডরিকস্টাড দুর্গ” নরওয়ের প্রাচীন স্থাপনা গুলোর মধ্যে একটি। এবং বলা হয়ে থাকে এই দুর্গটি স্ক্যান্ডে নেভিয়ার সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত প্রাচীন শহর। এই দুর্গটি 1663 সাল থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্য স্থাপন করা হয়।

দেশটিতে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের মধ্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক। ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নরওয়ে জিয়ান দের মধ্যে ৯৩% মানুষ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন।

খেলাধুলা নরওয়েজিয়ান সংস্কৃতির মধ্য একটি অন্যতম অংশ। ফুটবল এবং হ্যান্ডবল এইদেশের জনপ্রিয় খেলা গুলোর মধ্যে একটি। অর্থনৈতিকভাবে দেশটি অনেক ভালো পজিশনে রয়েছে এবং উন্নত। এখানকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিশ্র অর্থনীতি দেশটির শিল্পায়নের পর থেকে দারুণ উন্নতি করেছে।

মৎস্য শিল্প প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অপরিশোধিত তেল এই দেশের অর্থনীতির মূল ভীম। নরওয়ে মুক্ত অর্থনীতির অনুসারী। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তোহবিলের হিসেবে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে দেশটি বিশ্বে চতুর্থ।

নরওয়ের সরকারি মুদ্রা “নরওয়েজিয়ান ক্রোনে”। এক নরওয়ে জিয়ান ক্রনে সমান বাংলাদেশি 9 টাকা 20 পয়সা এবং ৭.৬৯ ভারতীয় রুপি।

দেশটির মোট জিডিপি প্রায় ৪৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ৮২ হাজার ৭১১ মার্কিন ডলার। নরওয়ের ডায়ালিং কোড হচ্ছে +৪৭। আমাদের আজকের পোস্টে নরওয়ে সম্পর্কে এখানেই শেষ করছি। আপনাদের কোন কিছু জানার থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করুন।

আরো দেখুনঃ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *