বাঘ সম্পর্কে অজানা তথ্য -বিস্তারিত জেনে রাখুন

বিড়াল প্রজাতির যতগুলো প্রাণী আছে তার মধ্যে সবচেয়ে আকারে বড় হচ্ছে বাঘ। আবার বাঘেদের মধ্য সবচাইতে বড় হচ্ছে সাইবেরিয়ান বাগ এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বিড়াল সাধারণত পানি দেখলেই পালিয়ে যায় অথচ বাঘ পানিতে সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। এবং এর সাঁতারের গতিবেগ অলিম্পিকের সাঁতারুদের থেকেও বেশি।-Facts About Tiger

একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের দৈনিক মাংসের চাহিদা গড়ে আট থেকে দশ কেজি। তবে এরা সর্বোচ্চ 40 কেজি পর্যন্ত মাংস খেতে পারে। বাঘ লম্বায় 3. 3 মিটার বা ১১ ফিট এবং ওজনে ৩০০ কেজি পর্যন্ত হয়। এদের ওজন এবং আকার প্রজাতি ভেদে ভিন্ন হয়। বাঘ সাধারণত একা চলতে পছন্দ করে। তবে মা বাঘ বাচ্চাদের বড় করার আগ পর্যন্ত সাথেই রাখে।

আশ্চর্যের একটি বিষয় হচ্ছে বাঘ এমন একটি প্রাণী যা কিনা এর স্বজাতি নারী এবং শাবক বাঘদেরও স্বীকার করে থাকে। বাঘের থাবায় মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর হাড় ভেঙে যেতে পারে এমনকি মারাও যেতে পারে।

বাংলায় বাঘ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ বাঘ্রো থেকে এসেছে। ফরাসি ভাষায় বাঘ এবং সিংহ বোঝাতে শের শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাঘ শব্দটির ধারাম মূলত বড় প্রাণীকে বোঝায়।

বাঘের মধ্য বিশেষ এক ধরনের ক্ষমতা রয়েছে আর তা হল অন্যান্য প্রাণীদের ডাক অনুকরণ করা। বাঘ অন্যান্য প্রাণীদের ডাক নকল করে তাদের ফাঁদে ফেলতে পারে। তবে এই কাজটি অধিকাংশ সময়ে ভাল্লুকের সাথেই করে থাকে।

বাঘের জীবনকালের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এরা জঙ্গল এবং খাচায় উভয় স্থানে 20 থেকে 25 বছর বেঁচে থাকে। অধিকাংশ বাগ 25 বছরের পূর্বেই মারা যায়। ফ্লরিডার চিড়িয়াখানায় ফ্লাভেল নামের একটি বাঘ ২৫ বছর বেঁচে ছিল।

বাঘ একটি ভয়ঙ্কর শিকারী প্রাণী। স্বীকার করার জন্য এদের রয়েছে ধারালো নখ এবং দাঁত। বাঘের সামনের দাঁত ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয় যা বিড়াল প্রজাতির মধ্যে সবথেকে বড়। বাঘের নখ ৩ ইঞ্চিরও বেশি লম্বা হয়।

বাঘের শরীরে ডোরাকাটা দাগ দেখতে পাওয়া যায়। এই দাগ কারো সঙ্গে কারো মিল নেই। ডোরাকাটা এই দাগ গুলো বাঘের পশমের নিচে চামড়ায়ও দেখতে পাওয়া যায়। বাঘ খুব কম গর্জন করে থাকে। তবে গর্জন করলে নির্জনতায় তিন কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়।

এরা সাধারণত দূরবর্তী বাঘেদের সাথে যোগাযোগ করতে গর্জন করে থাকে। বাঘ সবচেয়ে দ্রুততম প্রাণী না হলেও শিকার করার ক্ষেত্রে এরা ঘন্টায় ষাট কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। তবে এটি শুধুমাত্র স্বল্প সময়ের জন্য। এরা স্থলে বসবাসের পাশাপাশি পানিতে বেশ গতিতে সাঁতার কাটতে পারে। এদের সাঁতারের গতিবেগ ঘন্টায় ৩২ কিলোমিটার।

বাঘ ঘন্টার পর ঘন্টা পানিতে সাঁতার কেটে এবং খেলাধুলা করে কাটিয়ে দিতে পারে। এরা পানি খুব পছন্দ করে। এছাড়া এরা পানিতে শিকার ধরে থাকে। অনেক সময় এরা মাছ খেয়ে থাকে। বাঘ দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত না খেতে পেলে মারা যায়। বাঘের স্মৃতিশক্তি অনেক ভালো। কারণ এদের মস্তিষ্ক অনেক বড় যার প্রায় ৩০০ গ্রাম বা এর বেশি।

বাঘের স্বল্পমেয়াদি স্মরণশক্তি মানুষের চেয়ে 30 গুণ বেশি। বাঘের হাত এবং পা উভয়েই বেশ মজবুত। এদের পা এতটাই মজবুত যে মারা যাবার পরেও এরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। অপরদিকে বাঘের হাতের শক্তি ভয়াবহ। সামনের হাতের একটি থাবা যে কোন মানুষের হাড় ভেঙে ফেলতে সক্ষম বা মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

বাঘের লালায় অ্যান্টিসেপটিক সালাইভা থাকে। কখনো বাঘের শরীরে ক্ষত হলে সেখানে চেটে পরিষ্কার করে। এবং লালার জন্য ক্ষতস্থান টি জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়। বাঘের চোখ সাধারণত হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। কিন্তু সাদা বাঘের চোখ নীল বর্ণের হয়ে থাকে।

একটি বাঘ তিন থেকে চার বছর বয়সের হলে বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। বাঘের একসাথে দুই থেকে পাঁচটি বাচ্চা হয়। বাঘের শাবকের অর্ধেকি মারা যায়। কারণ বাঘের বাচ্চারা অন্ধ হয়ে জন্মায়। এদের চলাফেরা সহ খুদা এবং ঠান্ডায় মারা যায়। বাচ্চারা মায়ের ঘ্রাণ অনুসরণ করে পথ চলে। বাঘের বাচ্চারা এক থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের সাথেই থাকে।

বাঘের অধিকাংশ বাচ্চা ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে জন্মায়। এদের গর্ভকাল সময় আনুমানিক ১৪ থেকে ১৫ সপ্তাহ। এরা রাতে শিকার করতে বেশি পছন্দ করে। কারণ রাতের বেলায় শিকার কে সহজেই আয়ত্ত করা যায়। তবে বাঘ ভোরে এবং সন্ধ্যাবেলায় শিকার করে থাকে।

শিকার করার পূর্বে এরা যোপ-ঝাড়ের মধ্যে ঘাঁটি মেরে বসে থাকে। এবং হঠাৎ করে আক্রমণ করে। এরা মাংসাশী প্রাণী তাই সকল ধরনের প্রাণীই খায়। তবে এরা সচরাচর হরিণ গরু ছাগল পাখি বানর কুমির গন্ডার মহিষ ও শুকর শিকার করে থাকে। তবে খিদে পেলে এরা চিতা বাঘ গন্ডার কুমির ভাল্লুক এবং অজগর কেউ শিকার করে।

বাঘ বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে পারে। এরা উষ্ণ মণ্ডলীয় অরণ্য ম্যানগ্রোভ বন জলাভূমি পত্র মুচি বন এবং রাশিয়ার হিম শীতল এলাকায় ও বাঘেরা বসবাস করে। ১০০ বছর আগে পৃথিবীতে বাঘ ছিল এক লক্ষেরও বেশি। তবে বর্তমানে এর সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে বাঘ রয়েছে ৩৯০০ টির মত।

পৃথিবীর মাত্র ১৩ টি দেশে বাঘ রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ ভারত ভারত থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া মায়ানমার কম্বোডিয়া চীন ভিয়েতনাম মালেশিয়া লাওস নেপাল ভুটান ও রাশিয়া।

অতীতে বাঘেদের ৮ টি উপপ্রজাতি থাকলেও বর্তমানে এই সকল দেশে বাঘের পাঁচটি উপপ্রজাতি টিকে আছে। এই প্রজাতিগুলো হল বেঙ্গল টাইগার সাইবেরিয়ান টাইগার সাউথ চায়না টাইগার সুমাত্রান টাইগার এবং ইন্দ চায়না টাইগার। এই পাঁচটি উপ জাতের মধ্য বেঙ্গল টাইগার বসবাস করে বাংলাদেশ-ভারত চীন নেপাল ভুটান ও পশ্চিম মায়ানমারে।

আর সাইবেরিয়ান টাইগার বসবাস করে রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় ও উত্তর চিনে। সাউথ চায়না বাঘ কেবল দক্ষিণ চীন এই বসবাস করে। ইন্দো চায়না বাঘ বসবাস করে চীন লাওস মালয় থাইল্যান্ড পূর্ব মায়ানমার ও ভিয়েতনামে। আর সুভান্ত্রাণ টাইগার বসবাস করে সুমাত্রায়।

বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাঘের কিছু প্রজাতি হলো বালি বাঘ জাভা দেশীয় বাঘ ও কাসফিয়ান বাঘ। গত ৮০ বছরে এই প্রজাতি গুলো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বাঘ বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। যেমন সাদা সোনালী মালটিস এবং কালো। সাদা বাঘ গুলো হচ্ছে বাঘেদের নতুন এক ফ্যাশন।

পৃথিবীর বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় এই সাদা বাঘ দেখা যায়। অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতে সাদা বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার এর নিউট্রিয়েন্ট। সাদা বাঘ সর্বপ্রথম ধরা হয় টেনকানলনের বন থেকে। কিছু কিছু সাদা বাঘের গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকে না।

এরা যেহেতু শিকারী প্রাণী তাই শিকার করার সময় শিকারের সাথে লড়াই করতে পছন্দ করে। এ শরীলে ডোরাকাটা দাগ বেশ উপকারে আসে। কারণ এই দাগের জন্য অনায় এসে ঝোপ ঝাড়ের মধ্য লুকানো যায়।

গত ১০০ বছরে যে হারে বাঘের সংখ্যা কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এমন ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছর পরে বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যার জন্য অনেক দেশে ইতিমধ্য বাঘ রক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বাঘ টিকিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রতিবছর ২৯ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস।

বিশ্বজুড়ে বাঘ বিপন্ন তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে রাশিয়ায় প্রথমবারের মতো বাঘ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের লক্ষ্য 12 বছরে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে হবে। বিশ্বে যে সকল দেশে বাঘ বসবাস করে প্রত্যেক দেশই এই প্রাণীকে রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আরো দেখুনঃ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *